চিরস্থায়ী ধারা
লেখকের প্রস্তাব: সংবিধানে একটি নতুন অনুচ্ছেদ ১৪২ক, যা তিন লক্ষ্য, সমাজতন্ত্রের ন্যূনতম বিষয়বস্তু আর প্রজাতন্ত্রের গণতান্ত্রিক চরিত্রকে কোনো সংশোধনেই বদলাতে দেবে না। এটি বর্তমান আইন নয়, প্রস্তাব।
প্রস্তাবিত পাঠ
১৪২ক। চিরস্থায়ী বিধান।
(১) এই সংবিধানের অন্য কোনো বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, সংবিধানের এমন কোনো সংশোধন বৈধ হইবে না, যাহা—
(ক) স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে ঘোষিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারকে প্রজাতন্ত্রের মৌলিক লক্ষ্য হিসাবে বিলোপ, রহিত বা খর্ব করে;
(খ) সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূলনীতি হিসাবে মানুষের উপর মানুষের শোষণ হইতে মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব বিলোপ বা রহিত করে;
(গ) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপদ পানিসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণ সকলের জন্য নিশ্চিত করিবার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব বিলোপ বা রহিত করে;
(ঘ) রাষ্ট্রীয় মালিকানা, সমবায়ী মালিকানা ও সামাজিক মালিকানার সাংবিধানিক স্বীকৃতি বিলোপ করে;
(ঙ) প্রজাতন্ত্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র, এবং অবাধ ও নিয়মিত নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের শাসন বিলোপ করে; অথবা
(চ) এই অনুচ্ছেদ সংশোধন বা রহিত করে।
(২) দফা (১)-এ উল্লিখিত লক্ষ্য ও দায়িত্বসমূহ বাস্তবায়নের পদ্ধতি, প্রতিষ্ঠান, হার বা সময়সূচি-সংক্রান্ত বিধান অনুচ্ছেদ ১৪২ অনুযায়ী সংশোধনযোগ্য হইবে; তবে কোনো সংশোধন এমন হইবে না যাহাতে উক্ত লক্ষ্য বা দায়িত্বের মর্মবস্তু বিনষ্ট হয়।
(৩) কোনো সংশোধন দফা (১) লঙ্ঘন করে কি না, সেই প্রশ্ন নিষ্পত্তির এখতিয়ার সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের থাকিবে; এবং কোনো সংশোধনী বিল সংসদে গৃহীত হইবার পর রাষ্ট্রপতি তাহাতে সম্মতিদানের পূর্বে এই প্রশ্নে আপিল বিভাগের মতামত চাহিতে পারিবেন।
দফা (খ), (গ), (ঘ) আর (ঙ)-এর ভাষা নেওয়া হয়েছে ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ১০, ১৫, ১৩ আর ১১ থেকে। নতুন কোনো আদর্শ যোগ হচ্ছে না; ১৯৭২-এর নিজের প্রতিশ্রুতিকেই সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে। দফা (গ)-তে দুটি জিনিস যোগ হয়েছে পর্ব ৪-এর প্রস্তাবিত অনুচ্ছেদ ১০-এর দফা (ক) থেকে: নিরাপদ পানি, আর “সকলের জন্য”। দায়িত্বটা যেন সবার প্রতি থাকে, কারও প্রতি কম নয়। কিন্তু সময়সীমা, বিদ্যুৎ আর অবিলম্বে প্রাপ্য চার ন্যূনতম চিরস্থায়ী ধারায় আনা হয়নি; সেগুলো বাস্তবায়নের পদ্ধতি আর সময়সূচি, যা দফা (২) অনুযায়ী বদলানো যায়। চিরস্থায়ী ধারায় থাকে নীতি, কর্মসূচি নয়।
কেন চিরস্থায়ী
ঘোষণাপত্র বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠাই করেছে তিন লক্ষ্য “নিশ্চিত করণার্থে”। লক্ষ্য বাতিল মানে রাষ্ট্রের জন্মের শর্ত বাতিল। আর অভিজ্ঞতা বলে, অর্থনৈতিক পথ সংবিধানে নোঙর করা না থাকলে তা উল্টে যায় — বাংলাদেশে ১৯৭৫-এর পর ঠিক তা-ই হয়েছিল। তাই তিন লক্ষ্যের সঙ্গে সাম্যের অপরিহার্য অর্থনৈতিক পথের মর্মবস্তু, আর মর্যাদার অপরিহার্য পথ গণতন্ত্র, চিরস্থায়ী সুরক্ষায় থাকবে।
এটা নতুন কোনো ধারণা নয়। জার্মানির মৌলিক আইনের অনুচ্ছেদ ৭৯(৩) অনুযায়ী অনুচ্ছেদ ১ (মানবিক মর্যাদা অলঙ্ঘনীয়) আর অনুচ্ছেদ ২০ (“গণতান্ত্রিক ও সামাজিক” রাষ্ট্র)-এর নীতিকে ক্ষুণ্ণ করে এমন কোনো সংশোধন গ্রহণযোগ্য নয়।১ প্রস্তাবিত ১৪২ক একই যুক্তিতে কাজ করে; জার্মানির “সামাজিক রাষ্ট্র”-এর জায়গায় এখানে স্পষ্ট ভাষায় “সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূলনীতি”।
অনুচ্ছেদ ৭খ থেকে পার্থক্য
| অনুচ্ছেদ ৭খ (২০১১) | প্রস্তাবিত ১৪২ক | |
|---|---|---|
| পরিধি | প্রস্তাবনা, প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগের সব অনুচ্ছেদসহ অর্ধশতাধিক অনুচ্ছেদ | ছয়টি দফা |
| বিষয় | খুঁটিনাটি বিধান, এমনকি নাগরিক পরিচয়ের সংজ্ঞা | কেবল বিমূর্ত লক্ষ্য আর মৌলিক দায়িত্ব |
| বাস্তবায়নের নমনীয়তা | নেই | পদ্ধতি, প্রতিষ্ঠান, হার সংশোধনযোগ্য (দফা ২) |
| বিচারিক তদারকি | নেই | আপিল বিভাগ (দফা ৩) |
| পরিণতি | হাইকোর্ট (১৭ ডিসেম্বর ২০২৪) বাতিল করেছে, আপিল বিভাগ (৯ জুলাই ২০২৬) তা বহাল রেখেছে২ | — |
আদালতের আপত্তি ছিল সংশোধন-ক্ষমতার ঢালাও বিলুপ্তিতে। ১৪২ক সংশোধন-ক্ষমতা রাখে, কেবল মর্মবস্তু রক্ষা করে — যা বাংলাদেশের নিজের মৌলিক কাঠামো মতবাদেরই লিখিত রূপ। ১৯৮৯ সালে আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বনাম বাংলাদেশ মামলায় আপিল বিভাগ প্রথম এই মতবাদ গ্রহণ করে: সংসদ সংবিধান সংশোধন করতে পারে, কিন্তু তার মৌলিক কাঠামো ধ্বংস করতে পারে না।৩
সম্ভাব্য আপত্তি
- “এক প্রজন্ম কেন পরের প্রজন্মের হাত বাঁধবে?” হাত বাঁধা হচ্ছে কেবল লক্ষ্যে আর মৌলিক দায়িত্বে, পথের খুঁটিনাটিতে নয়। প্রতিটি প্রজন্ম নিজের নীতি, প্রতিষ্ঠান আর গতি ঠিক করতে পারবে।
- “জনগণ সার্বভৌম; গণভোটেও কেন বদলানো যাবে না?” জার্মান ধারাও গণভোটে বদলানো যায় না। কিছু মূল্য সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছার ঊর্ধ্বে রাখা হয়, যাতে ভবিষ্যতের কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র বা সংখ্যালঘুর মর্যাদা কেড়ে নিতে না পারে। এটা গণতন্ত্রবিরোধী নয়; গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত রক্ষা। আর ধারাটি নিজেও চাপিয়ে দেওয়া হবে না: লেখকের প্রস্তাব, ১৪২ক গৃহীত হবে সংসদের তিন-চতুর্থাংশ ভোট আর গণভোটে অংশগ্রহণকারী ভোটারের অন্তত ৬০ শতাংশের সমর্থনে, অর্থাৎ মূলনীতি বদলানোর জন্য সংশোধনের তিন স্তর-এর কঠিনতম স্তরের শর্ত, সেই শর্তেই। ভবিষ্যতের হাত বাঁধার সিদ্ধান্ত নেবে এই প্রজন্মের জনগণ নিজেই, কোনো দল বা সংসদ একা নয়।
- “আইনি ধারা থাকলেই কি রক্ষা হবে?” না, একা নয়। ১৯৭৫ আর ১৯৭৭ দেখিয়েছে, ক্ষমতা দখলকারী সংবিধান মানে না। চিরস্থায়ী ধারা আইনি রক্ষাকবচ; শেষ রক্ষাকবচ সংগঠিত জনগণ।
চিরস্থায়ী ধারা ছাড়া কী থাকে
চিরস্থায়ী ধারা লেখকের সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী প্রস্তাব, কারণ তা ভবিষ্যতের সব সংসদ আর গণভোটের ক্ষমতাও সীমিত করে; পাঠক তাতে একমত না-ও হতে পারেন। তাই একটি কথা স্পষ্ট করা দরকার: জবাবদিহির বাকি কাঠামো চিরস্থায়ী ধারার ওপর নির্ভর করে না। দুটি প্রস্তাব দুটি আলাদা প্রশ্নের উত্তর। চিরস্থায়ী ধারা উত্তর দেয়: লক্ষ্য কি কখনো বাতিল করা যাবে? জবাবদিহির কাঠামো উত্তর দেয়: যে লক্ষ্য সংবিধানে আছে, তা কি বাস্তবে মানা হচ্ছে?
১৯৭২-এর মূলনীতি বাতিল হয়ে ব্যর্থ হয়নি; সংবিধানে থেকেও কাগজে রয়ে গিয়েছিল। সেই ব্যর্থতার উত্তর জবাবদিহির কাঠামো: পাঁচ মানদণ্ড, সাধারণ আইনে লক্ষ্যমাত্রা, পর্যবেক্ষণ কমিশন, সংসদীয় জবাবদিহি, শর্তসাপেক্ষ বলবৎযোগ্যতা আর নাগরিক অংশগ্রহণ। এর কোনোটিই চিরস্থায়ী ধারা ছাড়া অচল হয় না।
চিরস্থায়ী ধারা গৃহীত না হলে বদলাবে কেবল সুরক্ষার মাত্রা:
- তিন লক্ষ্য আর মূলনীতির সর্বোচ্চ সুরক্ষা হবে সংশোধনের তিন স্তর-এর স্তর ৩: সংসদের তিন-চতুর্থাংশ ভোট আর গণভোটে অংশগ্রহণকারী ভোটারের অন্তত ৬০ শতাংশের সমর্থন। বদলানো কঠিন হবে, অসম্ভব নয়।
- তার পেছনে থাকবে আপিল বিভাগের মৌলিক কাঠামো মতবাদ (আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, ১৯৮৯), যা সংবিধানে লেখা না থাকলেও আদালতের নজির হিসেবে কার্যকর।
- পর্যবেক্ষণ কমিশন, সংসদ আর আদালতের কাজ একই থাকবে; তারা মাপবে আর আদায় করবে সংবিধানে লেখা মূলনীতি আর দায়িত্ব।
উল্টো দিকের কথাটা আরও গুরুত্বপূর্ণ: জবাবদিহির কাঠামো ছাড়া চিরস্থায়ী ধারা প্রায় অর্থহীন। ২০১১-র অনুচ্ছেদ ৭খ মূলনীতিগুলোকে সংশোধন-অযোগ্য করেছিল, তবু সেগুলো আগের মতোই কাগজে থেকে গেছে। তাই লেখকের প্রস্তাবের ক্রম স্পষ্ট: আগে জবাবদিহি, তারপর চিরস্থায়িত্ব। পাঠক চিরস্থায়ী ধারা প্রত্যাখ্যান করলেও জবাবদিহির বাকি কাঠামো তাঁর জন্যও প্রযোজ্য।
টীকা
Basic Law for the Federal Republic of Germany, অনুচ্ছেদ ১, ২০, ৭৯, সরকারি ইংরেজি অনুবাদ, https://www.gesetze-im-internet.de/englisch_gg/englisch_gg.html (প্রবেশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬)।ফিরুন
হাইকোর্ট বিভাগের রায়, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৪; আপিল বিভাগ, ৯ জুলাই ২০২৬; “Supreme Court upholds HC verdict restoring caretaker government, referendum provisions,” Dhaka Tribune, ৯ জুলাই ২০২৬, https://www.dhakatribune.com/bangladesh/court/414678/sc-clears-way-for-caretaker-government-provision-s (প্রবেশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬)।ফিরুন
Anwar Hossain Chowdhury v Bangladesh, (1989) BLD (AD) (Spl) 1 (রায়: ২ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯)। মতবাদের ব্যাখ্যা: Kawser Ahmed, “What is actually the basic feature doctrine?,” The Daily Star, ৪ জুন ২০১৮, https://www.thedailystar.net/law-our-rights/what-actually-the-basic-feature-doctrine-1586476 (প্রবেশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬)।ফিরুন