পাঁচ মানদণ্ড (SMART)
১৯৭২-এর মূলনীতি কাগজে থেকে গিয়েছিল, কারণ সেগুলো মাপা, আদালতে চাওয়া বা কারও কাছে জবাব চাওয়ার কোনো পথ ছিল না। লেখক প্রস্তাব করেন, প্রতিটি মূলনীতিকে পাঁচটি মানদণ্ডে বাঁধতে হবে, আর সংখ্যাগুলো রাখতে হবে সংবিধানে নয়, সাধারণ আইনে।
কেন ১৯৭২-এর মূলনীতি কাগজে থেকে গেল
লেখকের বিশ্লেষণে তিনটি কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে।
এক: লক্ষ্য ছিল, পরিমাপ ছিল না
১৯৭২-এর সংবিধান পথ দেখিয়েছিল। অনুচ্ছেদ ১৩, ১৪ আর ১৫ সমাজতন্ত্রের নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিত। কিন্তু কোথাও বলা ছিল না, কতটা অর্জন হলে সফল ধরা হবে, কত বছরে, আর কে তা মাপবে। ফলে প্রতিটি সরকার দাবি করতে পারত যে তারা বাস্তবায়ন করছে, আর কেউ প্রমাণ করতে পারত না যে দাবিটি মিথ্যা।
দুই: আদালতে যাওয়ার পথ বন্ধ
অনুচ্ছেদ ৮(২) বলে, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি আইন প্রণয়ন আর সংবিধানের ব্যাখ্যায় নির্দেশক হবে, কিন্তু আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য হবে না১। তাই রাষ্ট্র অনুচ্ছেদ ১৫-এর মৌলিক প্রয়োজন পূরণের দায়িত্ব উপেক্ষা করলেও কোনো নাগরিক সরাসরি সেই দায়িত্ব বলবৎ করার মামলা করতে পারেন না।
তবে পথ পুরোপুরি বন্ধ নয়। বাংলাদেশের আদালত জীবনের অধিকারের (অনুচ্ছেদ ৩১ ও ৩২) পরিধি বাড়িয়ে তাতে পরিবেশ (ড. মহিউদ্দিন ফারুক মামলা)২ আর জীবিকা (আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বস্তি উচ্ছেদ মামলা)৩ অন্তর্ভুক্ত করেছে। এই প্রসার এসেছে জীবনের অধিকারের ব্যাখ্যা থেকে, মূলনীতি বলবৎ করে নয়। বস্তি উচ্ছেদ মামলায় আদালত মৌলিক প্রয়োজনের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করলেও স্পষ্ট বলেছে, সেটি আদালতে বলবৎযোগ্য নয়৩। লেখকের প্রস্তাব তাই এই নজির থেকেই পরের ধাপ: মূলনীতিকে "ব্যাখ্যার সহায়ক" থেকে "শর্তসাপেক্ষে বলবৎযোগ্য" করা।
তিন: কেউ দেখার ছিল না
১৯৭২-এর সংবিধানে কোনো স্বাধীন পর্যবেক্ষণ সংস্থা ছিল না, কোনো বার্ষিক অগ্রগতি প্রতিবেদন ছিল না, লক্ষ্য না মিটলে সংসদে জবাব দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও ছিল না। লেখকের ভাষ্যে, প্রণেতারা নিজেরাই দুই বছরের মধ্যে গণতন্ত্রের পথ থেকে সরে গিয়েছিলেন, আর তাঁদের থামানোর মতো কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না।
পাঁচ মানদণ্ড কী
লেখকের প্রস্তাব: যেকোনো মূলনীতি, পুরোনো হোক বা নতুন, বাস্তবায়নযোগ্য হতে হলে পাঁচটি মানদণ্ড পূরণ করতে হবে। ব্যবস্থাপনার ভাষায় একে বলে SMART, পাঁচটি ইংরেজি শব্দের আদ্যক্ষর থেকে।
| মানদণ্ড | অর্থ | উদাহরণ |
|---|---|---|
| সুনির্দিষ্ট (Specific) | মূলনীতির অর্থ স্পষ্ট লেখা থাকবে | "সমাজতন্ত্র" মানে লেখকের কার্যভিত্তিক সংজ্ঞার সাত কাজ |
| পরিমাপযোগ্য (Measurable) | অগ্রগতি সংখ্যায় মাপা যাবে | সাম্য মাপা হবে জিনি সহগ, দারিদ্র্যহার, আয়ের ভাগ দিয়ে |
| অর্জনযোগ্য (Achievable) | ধাপে ধাপে, বাস্তবসম্মত গতিতে | প্রতি মেয়াদে নির্দিষ্ট অগ্রগতি, একলাফে নয় |
| প্রাসঙ্গিক (Relevant) | তিন লক্ষ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত | ধর্মনিরপেক্ষতা মাপা হবে অনুচ্ছেদ ১২-এর চার দায়িত্ব দিয়ে |
| সময়সীমাবদ্ধ (Time-bound) | নির্দিষ্ট মেয়াদে মূল্যায়ন | প্রতি বছর প্রতিবেদন, প্রতি পাঁচ বছরে সংসদে পূর্ণ মূল্যায়ন |
সংখ্যা সংবিধানে, না আইনে
একটি প্রস্তাব প্রায়ই শোনা যায়: জিনি সহগের লক্ষ্যমাত্রা (যেমন ০.৩০) সরাসরি সংবিধানে লেখা হোক। লেখক সেই পথে যান না। কারণ তিনটি।
- নজির নেই। লেখকের তুলনামূলক পাঠে কোনো জাতীয় সংবিধানে বৈষম্য কমানোর সংখ্যাগত লক্ষ্য পাওয়া যায়নি। কিছু সংবিধানে ব্যয়ের তলা আছে, যেমন ইন্দোনেশিয়া শিক্ষায় বাজেটের অন্তত ২০ শতাংশ বাধ্যতামূলক করে৪; কিন্তু সেটি ফলাফলের লক্ষ্য নয়।
- সংবিধানের সংখ্যা চাপে পড়লে বদলে যায়। জার্মানি সংবিধানে ঋণের সীমা বেঁধেছিল; ২০২৫ সালের মার্চে প্রতিরক্ষা ব্যয় আর ৫০০ বিলিয়ন ইউরো পর্যন্ত অবকাঠামো তহবিলের জন্য তা সংশোধন করতে হয়৫। ব্রাজিল ২০১৬ সালে সংবিধানে ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা লিখেছিল; ২০২২-এর ডিসেম্বরের সংশোধনী আর ২০২৩-এর আগস্টের পরিপূরক আইন তার জায়গা নেয়৬। সংখ্যা সংবিধানে থাকলে হয় সংবিধান ভাঙা হয়, নয় সংশোধন করতে হয়, আর দুটোই সংবিধানের মর্যাদা কমায়।
- সংখ্যা আদালতে গেলে বিচারকেরাই অর্থনীতির সিদ্ধান্ত নেবেন। সমালোচকেরা একে বলেন "বিচারকতন্ত্র"৭।
তাই লেখকের প্রস্তাবিত নকশা তিন স্তরের:
| স্তর | কী থাকবে | উদাহরণ |
|---|---|---|
| চিরস্থায়ী ধারা | তিন লক্ষ্য, সমাজতন্ত্রের ন্যূনতম বিষয়বস্তু, গণতান্ত্রিক চরিত্র | প্রস্তাবিত অনুচ্ছেদ ১৪২ক (চিরস্থায়ী ধারা) |
| সংবিধান | মূলনীতির সংজ্ঞা, আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব: লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা, প্রতিবছর প্রকাশ করা, লক্ষ্য না মিটলে সংসদ ও কমিশনের সামনে কারণ দেখানো | মূলনীতির নতুন অনুচ্ছেদ |
| সাধারণ আইন | নির্দিষ্ট সংখ্যা, হার আর সময়সূচি | "সাম্য ও মৌলিক প্রয়োজন আইন" |
এই নকশার মডেল নিউজিল্যান্ডের শিশু দারিদ্র্য হ্রাস আইন, ২০১৮। সেই আইন প্রতিটি সরকারকে তিন বছর আর দশ বছরের দারিদ্র্য-হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করতে আর বাজেটের সঙ্গে প্রতিবেদন দিতে বাধ্য করে; প্রতিবছর অগ্রগতি মেপে প্রকাশ করেন সরকারি পরিসংখ্যানবিদ। সংখ্যা ঠিক করে সরকার; দায়িত্ব আইনের৮।
বিপরীত সতর্কবার্তা যুক্তরাজ্য। ২০১০ সালে আইনে শিশু দারিদ্র্যের সংখ্যাগত লক্ষ্য লেখা হয়েছিল। লক্ষ্য মিটবে না, এমন পূর্বাভাসের মধ্যেই ২০১৬ সালে সরকার লক্ষ্যমাত্রার ধারাগুলো বাতিল করে, আইনের নামও বদলে যায়৯। এই কারণেই লেখকের প্রস্তাবে লক্ষ্য ঠিক করার দায়িত্ব থাকবে সংবিধানে, যাতে কোনো সরকার আইন বাতিল করে দায় এড়াতে না পারে।
চার মূলনীতি, পাঁচ মানদণ্ডে
এই সাইটে প্রতিটি মূলনীতির জন্য পাঁচ মানদণ্ডে আলাদা মাপকাঠি দেওয়া আছে: ভিত্তিমান, ৫ ও ১০ বছরের লক্ষ্য, আর কে দায়ী। এই সংখ্যাগুলো সাধারণ আইনের জন্য উদাহরণ; চূড়ান্ত সংখ্যা ঠিক করবে সংসদ।
- জাতীয়তাবাদ: স্বীকৃতিসহ নাগরিক পরিচয়
- সমাজতন্ত্র: গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র
- গণতন্ত্র: প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি
- ধর্মনিরপেক্ষতা: চার দায়িত্ব
সূত্র
- গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, অনুচ্ছেদ ৮(২), bdlaws.minlaw.gov.bd (প্রবেশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬)। ফিরুন
- Dr. Mohiuddin Farooque v. Bangladesh, 17 BLD (AD) 1 (১৯৯৭); 1 BLC (AD) 189 (১৯৯৬); সারসংক্ষেপ: "Farooque vs. Government of Bangladesh (Flood Action Plan Case)," ELAW, elaw.org (প্রবেশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬)। ফিরুন
- Ain o Salish Kendra (ASK) v. Government of Bangladesh, 19 BLD (HCD) 488 (১৯৯৯); সারসংক্ষেপ: ESCR-Net, escr-net.org (প্রবেশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬)। ESCR-Net-এর সারসংক্ষেপে: "this latter constitutional directive was not judicially enforceable"। ফিরুন
- Constitution of the Republic of Indonesia 1945 (২০০২ পর্যন্ত সংশোধিত), অনুচ্ছেদ ৩১(৪), Constitute Project, constituteproject.org (প্রবেশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬)। "সংখ্যাগত বৈষম্য-লক্ষ্য নেই" দাবিটি লেখকের তুলনামূলক পাঠের ভিত্তিতে; পূর্ণাঙ্গ ডেটাবেস-অনুসন্ধানের দাবি নয়। ফিরুন
- "Grundgesetzänderung für Verteidigung und Sondervermögen," Bundeszentrale für politische Bildung, ২৮ মার্চ ২০২৫, bpb.de (প্রবেশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬) (বুন্ডেসটাগ ১৮ মার্চ, বুন্ডেসরাট ২১ মার্চ ২০২৫)। ফিরুন
- Emenda Constitucional nº 95, de 15 de dezembro de 2016, planalto.gov.br; Emenda Constitucional nº 126, de 21 de dezembro de 2022, অনুচ্ছেদ ৬ ও ৯, planalto.gov.br; Lei Complementar nº 200, de 30 de agosto de 2023, planalto.gov.br (প্রবেশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬)। ফিরুন
- Ran Hirschl, Towards Juristocracy: The Origins and Consequences of the New Constitutionalism (২০০৪)। ফিরুন
- Child Poverty Reduction Act 2018 (New Zealand), ধারা ২১, ৩০–৩৭, ৪৯, legislation.govt.nz (প্রবেশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬)। ফিরুন
- Child Poverty Act 2010 (বর্তমান নাম Life Chances Act 2010), legislation.gov.uk; Welfare Reform and Work Act 2016, ধারা ৪–৭, legislation.gov.uk (প্রবেশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬)। লক্ষ্যমাত্রার ধারাগুলো ১৬ মে ২০১৬ থেকে রহিত। লক্ষ্য না মেটার পূর্বাভাস: "Child poverty: 2020 vision?," House of Commons Library (Key Issues for the 2015 Parliament), মে ২০১৫, parliament.uk (প্রবেশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬)। ফিরুন